
কৃষি ডেস্কঃ ভোরের আলো ফোটার আগেই মাঠে নেমে পড়েন কৃষক। কেউ তুলছেন টমেটো, কেউ বেগুন, কেউবা যত্ন করে সংগ্রহ করছেন তার উৎপাদিত ফসল। মাসের পর মাস পরিশ্রম, সার, বীজ, সেচ আর শ্রমিকের পেছনে অর্থ ব্যয় করে ফলানো এসব ফসল নিয়ে কৃষকের অনেক স্বপ্ন। তবে মাঠ থেকে ফসল তোলার পরই শুরু হয় আরেক লড়াই। সঠিক সময়ে বাজারে পৌঁছানো, পরিবহনের ব্যবস্থা করা, ভালোভাবে সংরক্ষণ করা এবং ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করা—প্রতিটি ধাপেই থাকে নানা বাধা। কখনো অতিরিক্ত গরমে, কখনো পরিবহনের ধাক্কায়, আবার কখনো সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায় তাজা ফলমূল ও শাক-সবজি। যে ফসল মানুষের খাবারের থালায় পৌঁছানোর কথা, তার একটি অংশ পথেই হারিয়ে যায়।
ফসল ফলানোর পরও কেন এত ক্ষতি
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সারাবছরই নানা ধরনের শাক-সবজি, ফল-মূল ও খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয়। কৃষকেরা নিজেদের উৎপাদিত পণ্য স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরে পাঠান। কিন্তু কৃষিপণ্য উৎপাদন থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সব সময় সম্ভব হয় না।
বিশেষ করে শাক-সবজি ও ফল-মূলের মতো পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জমি থেকে তোলার পর দীর্ঘসময় রোদে ফেলে রাখা, অপর্যাপ্ত প্যাকেজিং, অতিরিক্ত চাপ দিয়ে বস্তা বা ঝুড়িতে ভরা এবং উপযুক্ত পরিবহনের অভাব পণ্যের গুণগত মান নষ্ট করে। বাইরে থেকে সবজি দেখতে ভালো মনে হলেও ভেতরে ভেতরে পচন শুরু হতে পারে। এতে বাজারে পৌঁছানোর আগেই পণ্যের বিক্রয়যোগ্যতা কমে যায়।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশের নির্বাচিত ৩০টি উপজেলায় একটি জরিপ পরিচালনা করা হয়। যেখানে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা অংশ নেন। ওই গবেষণায় দেখা যায়, ৪১ শতাংশের বেশি কৃষক খোলা রোদে সরাসরি মাটির ওপর ফল ও সবজি স্তূপ করে রাখতেন। আরও জানা গেছে, খামার বা কৃষক পর্যায়ে ফসল সংগ্রহ-পরবর্তী অপচয়ের গড় হার ১২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ব্যবসায়ী পর্যায়ে পাইকারি বাজার পর্যন্ত এই অপচয়ের গড় হার ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। এসব হার নির্বাচিত এলাকার গবেষণার ফল, তবে পুরো দেশের ক্ষতির হার হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
পরিবহনেই বাড়ে ক্ষতির ঝুঁকি
গ্রামের অনেক কৃষক জমি থেকে ফসল তুলে প্রথমে ভ্যান, ছোট পিকআপ কিংবা স্থানীয় অন্যান্য যানবাহনে করে বাজার বা আড়তে নিয়ে যান। সেখান থেকে পণ্য যায় বড় পাইকারি বাজারে। এরপর আবার ছোট যানবাহনে খুচরা দোকানে পৌঁছায়। এই দীর্ঘযাত্রায় পণ্য বারবার ওঠানো-নামানো হয়। যথাযথ প্যাকেজিং না থাকলে একটির ওপর আরেকটি পণ্য চাপা পড়ে, নরম ফল থেঁতলে যায়, সবজির গায়ে আঘাত লাগে।
বিশেষ করে টমেটো, পাকা আম, পেঁপে, লিচু ও অন্যান্য নরম ফলের ক্ষেত্রে সামান্য আঘাতও দ্রুত পচনের কারণ হতে পারে। বস্তায় অতিরিক্ত সবজি ভরে বহন করলে নিচের দিকের পণ্যগুলো চাপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার যানজট, সড়কের দুরবস্থা কিংবা বাজারে যানবাহন প্রবেশের দীর্ঘ অপেক্ষায় পণ্যকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গরমের মধ্যে থাকতে হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার বিভিন্ন বিশ্লেষণে ফল-মূল ও শাক-সবজি পরিবহনের সময় অনুপযুক্ত প্যাকেজিং, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং যান্ত্রিক আঘাতকে খাদ্যক্ষতির গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পরিবহনে ক্ষতি হলে শুধু কৃষকই ক্ষতিগ্রস্ত হন না। ব্যবসায়ীর পণ্যের পরিমাণ কমে যায়, বিক্রির উপযোগী পণ্যের মান নষ্ট হয় এবং শেষ পর্যন্ত বাজারে সরবরাহের ওপরও প্রভাব পড়ে। এসব ক্ষতির ব্যয় বিভিন্নভাবে পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
টাঙ্গাইল ভযেস ২৪ ডেস্ক: 



















