ঢাকা ০৮:২০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সৌদিতে মসজিদে পবিত্রতার নামে মৃত্যুদণ্ড, নির্যাতিত মানুষের জন্য নীরবতা

প্রবাস ডেস্কঃ একটি মসজিদের পবিত্রতা রক্ষার নামে দুই মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। অন্যদিকে, সেই দেশেই গৃহশ্রমিক হিসেবে কাজ করতে যাওয়া নারীদের ওপর নির্যাতন, যৌন সহিংসতা ও শোষণের অভিযোগ বারবার সামনে আসছে। এই দুই বাস্তবতাকে পাশাপাশি রাখলে একটি মৌলিক প্রশ্ন দেখা দেয়: রাষ্ট্রের কাছে পবিত্রতার মর্যাদা বড়, নাকি মানুষের জীবন, শরীর ও স্বাধীনতার মর্যাদা?

২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর সৌদি আরব দুই বাংলাদেশি নাগরিক, নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগে তাদের বিচার হয়েছিল। আদালত তাআজির বা তা’জির নামে পরিচিত বিবেচনাধীন শাস্তির বিধানের অধীনে মৃত্যুদণ্ড দেয়। কিন্তু সরকারি বিবৃতিতে কথিত কাজটির সুনির্দিষ্ট বিবরণ, সংশ্লিষ্ট মসজিদের পরিচয় কিংবা গ্রেপ্তারের সময় জানানো হয়নি।

বাংলাদেশের জেদ্দা কনস্যুলেট জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাদের অবহিত করা হয়নি। ঘটনার কয়েক দিন পরও তারা সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষায় ছিল।

এখানে প্রশ্ন কেবল দুটি মৃত্যুদণ্ডের ন্যায্যতা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, একজন বিদেশি নাগরিকের জীবন কেড়ে নেওয়ার মতো গুরুতর সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিচারপ্রক্রিয়া, আইনি সহায়তা, কনস্যুলার যোগাযোগ ও স্বচ্ছতার মান কতটা নিশ্চিত করা হয়েছিল। অভিযোগ গুরুতর হলেই কি রাষ্ট্রের জবাবদিহির প্রয়োজন কমে যায়? বরং শাস্তি যত চূড়ান্ত, বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার দাবি তত বেশি হওয়া উচিত।

ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনসের ৩৬ অনুচ্ছেদ বিদেশে আটক নাগরিকদের কনস্যুলার যোগাযোগ ও সহায়তার অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলে। বাংলাদেশ ও সৌদি আরব উভয়ই এই কনভেনশনের পক্ষভুক্ত। কনস্যুলেটকে আগে জানানো হয়নি, এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ; তবে শুধু এই তথ্যের ভিত্তিতে কনভেনশন লঙ্ঘন চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা যায় না।

আটক ব্যক্তিদের তাদের অধিকার সম্পর্কে জানানো হয়েছিল কি না, কনস্যুলার যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না এবং প্রয়োজনীয় অনুরোধ করা হয়েছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখতে হবে। সৌদি কর্তৃপক্ষের উচিত এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দেওয়া। বাংলাদেশেরও উচিত আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা, প্রাসঙ্গিক নথি ও জবাবদিহি দাবি করা। কিন্তু আলোচনাটি এখানেই থামলে মানুষের অধিকারের বৃহত্তর সংকটটি আড়ালে থেকে যাবে।

মসজিদের পবিত্রতা, নারীর শরীরের মর্যাদা কোথায়?

বাংলাদেশ থেকে অসংখ্য নারী পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি, সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও নিজের জীবিকার আশায় সৌদি আরবে গৃহশ্রমিক হিসেবে যান। তাদের অনেকেই ফিরে আসেন নির্যাতন, শোষণ, অসুস্থতা কিংবা গভীর মানসিক ক্ষত নিয়ে। কেউ কেউ ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করেন।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে The Daily Star ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় দেশে ফিরে আসা এক নারীর নির্যাতনের অভিযোগ প্রকাশ করে। মার্চে Dhaka Tribune অধিকারকর্মীদের উদ্ধৃত করে জানায়, সাত বছরে প্রায় ৭০ হাজার নারী শ্রমিক সৌদি আরব থেকে ফিরেছেন এবং প্রায় ৮০০ নারীর মরদেহ দেশে আনা হয়েছে। এসব সংখ্যা যথাযথ সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে নয়, প্রতিবেদন ও অধিকারকর্মীদের দেওয়া হিসাব হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তবু ঘটনাগুলো যে গুরুতর তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি রাখে, তাতে সন্দেহ নেই।

একজন নারী কাজ করতে বিদেশে যান, নিজের শরীরের ওপর অধিকার হারাতে নয়। তার সম্মতি ছাড়া যৌন সম্পর্ক ধর্ষণ; নিয়োগকর্তার ক্ষমতা, অর্থ বা সামাজিক অবস্থান কোনোভাবেই সেই অপরাধকে বৈধ করে না। অথচ ব্যক্তিগত বাড়ির চার দেয়ালের মধ্যে সংঘটিত নির্যাতন অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। অভিযোগ জানাতে গেলে ভাষার সমস্যা, পাসপোর্ট বা মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া, চাকরি ও আবাসনের ওপর নিয়োগকর্তার নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রেপ্তার বা দেশে ফেরত পাঠানোর ভয় ভুক্তভোগীকে আরও অসহায় করে তোলে।

সৌদিতে মসজিদে পবিত্রতার নামে মৃত্যুদণ্ড, নির্যাতিত মানুষের জন্য নীরবতা

প্রকাশের সময় : ০৫:৫৮:১২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

প্রবাস ডেস্কঃ একটি মসজিদের পবিত্রতা রক্ষার নামে দুই মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। অন্যদিকে, সেই দেশেই গৃহশ্রমিক হিসেবে কাজ করতে যাওয়া নারীদের ওপর নির্যাতন, যৌন সহিংসতা ও শোষণের অভিযোগ বারবার সামনে আসছে। এই দুই বাস্তবতাকে পাশাপাশি রাখলে একটি মৌলিক প্রশ্ন দেখা দেয়: রাষ্ট্রের কাছে পবিত্রতার মর্যাদা বড়, নাকি মানুষের জীবন, শরীর ও স্বাধীনতার মর্যাদা?

২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর সৌদি আরব দুই বাংলাদেশি নাগরিক, নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগে তাদের বিচার হয়েছিল। আদালত তাআজির বা তা’জির নামে পরিচিত বিবেচনাধীন শাস্তির বিধানের অধীনে মৃত্যুদণ্ড দেয়। কিন্তু সরকারি বিবৃতিতে কথিত কাজটির সুনির্দিষ্ট বিবরণ, সংশ্লিষ্ট মসজিদের পরিচয় কিংবা গ্রেপ্তারের সময় জানানো হয়নি।

বাংলাদেশের জেদ্দা কনস্যুলেট জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাদের অবহিত করা হয়নি। ঘটনার কয়েক দিন পরও তারা সৌদি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষায় ছিল।

এখানে প্রশ্ন কেবল দুটি মৃত্যুদণ্ডের ন্যায্যতা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, একজন বিদেশি নাগরিকের জীবন কেড়ে নেওয়ার মতো গুরুতর সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিচারপ্রক্রিয়া, আইনি সহায়তা, কনস্যুলার যোগাযোগ ও স্বচ্ছতার মান কতটা নিশ্চিত করা হয়েছিল। অভিযোগ গুরুতর হলেই কি রাষ্ট্রের জবাবদিহির প্রয়োজন কমে যায়? বরং শাস্তি যত চূড়ান্ত, বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার দাবি তত বেশি হওয়া উচিত।

ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনসের ৩৬ অনুচ্ছেদ বিদেশে আটক নাগরিকদের কনস্যুলার যোগাযোগ ও সহায়তার অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলে। বাংলাদেশ ও সৌদি আরব উভয়ই এই কনভেনশনের পক্ষভুক্ত। কনস্যুলেটকে আগে জানানো হয়নি, এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ; তবে শুধু এই তথ্যের ভিত্তিতে কনভেনশন লঙ্ঘন চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা যায় না।

আটক ব্যক্তিদের তাদের অধিকার সম্পর্কে জানানো হয়েছিল কি না, কনস্যুলার যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না এবং প্রয়োজনীয় অনুরোধ করা হয়েছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখতে হবে। সৌদি কর্তৃপক্ষের উচিত এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দেওয়া। বাংলাদেশেরও উচিত আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা, প্রাসঙ্গিক নথি ও জবাবদিহি দাবি করা। কিন্তু আলোচনাটি এখানেই থামলে মানুষের অধিকারের বৃহত্তর সংকটটি আড়ালে থেকে যাবে।

মসজিদের পবিত্রতা, নারীর শরীরের মর্যাদা কোথায়?

বাংলাদেশ থেকে অসংখ্য নারী পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি, সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও নিজের জীবিকার আশায় সৌদি আরবে গৃহশ্রমিক হিসেবে যান। তাদের অনেকেই ফিরে আসেন নির্যাতন, শোষণ, অসুস্থতা কিংবা গভীর মানসিক ক্ষত নিয়ে। কেউ কেউ ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করেন।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে The Daily Star ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় দেশে ফিরে আসা এক নারীর নির্যাতনের অভিযোগ প্রকাশ করে। মার্চে Dhaka Tribune অধিকারকর্মীদের উদ্ধৃত করে জানায়, সাত বছরে প্রায় ৭০ হাজার নারী শ্রমিক সৌদি আরব থেকে ফিরেছেন এবং প্রায় ৮০০ নারীর মরদেহ দেশে আনা হয়েছে। এসব সংখ্যা যথাযথ সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে নয়, প্রতিবেদন ও অধিকারকর্মীদের দেওয়া হিসাব হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তবু ঘটনাগুলো যে গুরুতর তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি রাখে, তাতে সন্দেহ নেই।

একজন নারী কাজ করতে বিদেশে যান, নিজের শরীরের ওপর অধিকার হারাতে নয়। তার সম্মতি ছাড়া যৌন সম্পর্ক ধর্ষণ; নিয়োগকর্তার ক্ষমতা, অর্থ বা সামাজিক অবস্থান কোনোভাবেই সেই অপরাধকে বৈধ করে না। অথচ ব্যক্তিগত বাড়ির চার দেয়ালের মধ্যে সংঘটিত নির্যাতন অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। অভিযোগ জানাতে গেলে ভাষার সমস্যা, পাসপোর্ট বা মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া, চাকরি ও আবাসনের ওপর নিয়োগকর্তার নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রেপ্তার বা দেশে ফেরত পাঠানোর ভয় ভুক্তভোগীকে আরও অসহায় করে তোলে।